১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, নিপীড়ন, সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের চড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের এই সশস্ত্র সংগ্রাম।
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি স্থাপন করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে।
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে। ঢাকার রাস্তায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেনানিবাসে নির্বিচারে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।
১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের অধীনে পুরো দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে সুসংগঠিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। প্রবাসী সরকার, দেশপ্রেমিক বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনী (ভারতের সশস্ত্র বাহিনী)-র যৌথ প্রচেষ্টায় পাকিস্তানি বাহিনীকে চারদিক থেকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়।
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। বিজয় অর্জিত হলেও একটি বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করার বিশাল চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। আমাদের এই অর্জিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও সত্য ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।